রাগ কন্ট্রোল রিলেটেড কিছু ঘটনা ও নসীহা

রাগ কন্ট্রোল রিলেটেড কিছু ঘটনা ও নসীহা-
এক মূহুর্তের রাগ, সারা জীবনের কান্না!
আল্লাহ্ ﷻ বলেছেন – “তোমরা রাগকে গিলে ফেলো” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪) ।
রাগ যদি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় তাহলে রাগের মাথায় আমরা এমন কিছু করে ফেলতে পারি বা বলে বসতে পারি, যার জন্য আজীবন অনুশোচনা করতে হবে!!!
রাগ-নিয়ন্ত্রণ তাই অতীব গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয়।
এই লেখায় আমি রাগ-সংক্রান্ত ৪টি হাদিস শেয়ার করবো ইনশাআল্লাহ।।
এই চারটি হাদিস থেকে দেখবো কেউ যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে রাগিয়ে দেয়ার মতো আচরণ করতেন, তখন তিনি ﷺ কিভাবে তা মোকাবেলা করতেন।
১) আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) ছিলেন ৭ কিম্বা ৮ বছরের ছোট্ট একটা ছেলে, আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) এর মা, আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন তাঁর (ﷺ এর) সেবা করার জন্য।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিভিন্ন ছোট-খাটো কাজ করে দিতেন আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু), যতটা না কাজ করতেন তারচেয়ে বেশী দুষ্টামীই করতেন!
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) কে বাইরে পাঠালেন, যাওয়ার পথে রাস্তার মধ্যে আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) কিছু ছেলেকে দেখলেন তারা খেলা করছে, তাদেরকে দেখে কাজের কথা ভুলে ছোট্ট আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু)ও খেলায় মজে গেলেন, খেলার ঘোরে কতক্ষণ কেটে গেছে আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু)এর আর খেয়ালই নাই, এমনি এক সময় আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) হঠাৎ অনুভব করলেন বিশাল সাইজের কোনো এক খেলোয়াড় তাকে পেছন থেকে ঘাড় চেপে ধরেছে! আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) মাথা ঘুরিয়ে দেখেন – একি! এ যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ এক মুখ হাসি নিয়ে উপস্থিত!
রাসূলুল্লাহ ﷺ আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু)কে জরুরী কোন কাজেই কিন্তু পাঠিয়েছিলেন, অনেক সময় পার হওয়ার পরেও আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) যখন ফিরলেন না, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্য রেগে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু তিনি আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহু) এর উপর তো রাগলেনই না, বরং বাস্তবিকই তার সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ মজা করলেন!
আমাদের সাথে যখন রেগে যাওয়ার মতো কিছু ঘটে, তখন লক্ষ্য করলে আমরা দেখবো ঘটনাটার একটা অাচরনগত দিকও আছে, আমাদের উচিত হবে ঘটনার রাগের অংশটি উপেক্ষা করে ব্যক্তির অভ্যাসগত বিষয়টির দিকে মনযোগ দেয়া।
পরামর্শ ১ঃ রাগকে মানসিক অবস্থা (এটাই স্বভাব) এরকমই মনে করে ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করুন।
২) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) খুব ভালো রান্না করতে
পারতেন না, রান্নার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন সাফিয়াহ (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) ও উম্মে সালামাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা)।
একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন অন্য সাহাবাদের নিয়ে আয়েশার (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) ঘরে বসে আলাপ করছিলেন, তখন উম্মে সালামাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) তাঁর রান্না করা খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। এতে আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) ভীষণ হিংসা অনুভব করলেন!
ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে -
– আমার রান্না কি এতই খারাপ যে অন্য ঘর থেকে খাবার আনতে হবে?
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) রেগে গিয়ে খাবারের প্লেটটাই ভেঙ্গে ফেললেন!
ভেবে দেখুন, অতিথির সামনে আপনার স্ত্রী যদি এমন আচরণ করে বসে তো আপনি কি করবেন?
একটু হলেও হয়তো “উফ” বলে উঠবেন, অন্তত এটুকু হয়তো বলে উঠবেন – “একি! এটা কি করলে তুমি?”
রাসূলুল্লাহ ﷺ সেরকম কিছু বললেন না, ভেঙে যাওয়া প্লেট এর টুকরোগুলো কুড়াতে কুড়াতে বাকী সাহাবাদেরকে বললেন – “তোমরা তোমাদের খাবার খেয়ে নাও”।
তারপর তিনি ﷺ বাকী সাহাবাদের সামনে আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) কে সুরক্ষা করার সুরে বললেন “তোমাদের মা হিংসা অনুভব করেছেন।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনভাবে কথাটা বললেন যে এটাতো কোন ব্যাপারই না, সব মানুষই তো কম- বেশী হিংসা অনুভব করে। শুধু তাই না
তিনি সাহাবা (রাদিআল্লাহু অানহুম)গণের মনে করিয়ে দিতে চাইলেন আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) এর মর্যাদা, তাই তিনি আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু অানহা) কে নাম ধরে না ডেকে “তোমাদের মা” বলে সম্বোধন করেছেন।
পরামর্শ ২ঃ কেউ রেগে গেলে তার প্রতি পাল্টা রাগ না করে তাকে সুরক্ষা করুন।
৩) একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখলেন এক মহিলা কবরের সামনে বেজায় কান্নাকাটি করছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, “আল্লাহকে ﷻ ভয় করো এবং ধৈর্য্য ধরো” মহিলাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে চিনতে না পেরে রেগে-মেগে বলে উঠলো “যান- এখান থেকে! আমার মত বিপদ তো আর আপনার হয়নি!” জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ রেগে গেলেন না, তাকে আরেকবার বুঝানোর চেষ্টাও করলেন না৷ এটাও বললেন না যে, “আমি হলাম আল্লাহর ﷻ রাসূল, আর আমার মুখে মুখে কথা!”, অথবা বললেন না- “আমি বললাম ভালো কথা আর তুমি কি না আমার সাথে এমন ব্যবহার করলে!” না, তিনি এরকম কিছুই করলেন না, তিনি চুপচাপ কিছু না বলে সেই স্থান থেকে চলে গেলেন।
পরামর্শ ৩ঃ রেগে থাকা মানুষকে বুঝাতে যাবেন না। তখন সে বুঝবে না, তাকে শান্ত হওয়ার জন্য সময় দিন।
৪) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তর্ক করা ছেড়ে দিবে সে যদি ভুলের পক্ষেও হয় তবুও সে জান্নাতের প্রান্তে বাড়ি পাবে। আর যে ব্যক্তি সঠিক হওয়ার পরেও তর্ক ছেড়ে দিবে, সে জান্নাতের মাঝখানে বাড়ি পাবে। আর যে ব্যক্তি নিজের চরিত্রের উন্নয়ন করবে সে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে বাড়ি পাবে।”
ভেবে দেখুন– কি লাভ আরেকজনের সাথে
তর্কাতর্কি করে, রাগারাগি করে, নিজের মেজাজ খারাপ করে, যুক্তির উপর যুক্তি তৈরী করে, শুধুই এটা প্রমাণ করা যে, “আমি সঠিক, তুমি ভুল”? !
এর মাধ্যমে না পাওয়া যায় নিজের মনে শান্তি, না করা যায় অন্যের মন জয়। অহেতুক অন্যের মনে কষ্ট দিয়ে নিজের ক্ষতি নিজেই ডেকে অানা হয়।
তার চেয়ে চুপ করে থেকে অন্যের ভুল উপেক্ষা করে নিজের জন্য জান্নাতে একটা বাড়ি নির্মান করা কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?
পরামর্শ ৪ঃ রাগ করার মত কারণ থাকা সত্ত্বেও তা ছেড়ে দিন, আর আল্লাহর ﷻ কাছে প্রতিদানের আশা রাখুন।
উপসংহারঃ
১) ইসলামে ব্যক্তিগত কারণে রাগ করার অনুমতি নেই, তবে যেসব কারণে আল্লাহ্ ﷻ ও তাঁর রাসূল ﷺ রাগ করেছেন (যেমন- কাউকে শিরক করতে দেখলে) সে সব কারণে রাগ করা বৈধ। তবে, এই রাগের বহিঃ প্রকাশও নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
২) লেখাটি পড়ে মনে করবেন না আমি রাগ- নিয়ন্ত্রনে উস্তাদ, বরং উল্টোটা এখনো অামার মাঝে বিদ্যমান।
লেখাটি আমি লিখেছি সবচেয়ে বেশী নিজেকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য, এটা যদি অন্য কারো উপকারে
আসে তো আলহামদুলিল্লাহ!
রেফারেন্সঃ
হাদিস ১ঃ মুসলিম ২৩১০ ,
হাদিস ২ঃ সুনান আন-নাসাঈ ৩৯৭৩,
হাদিস ৩ঃ বুখারী ১২২৩,
হাদিস ৪ঃ তিরমিযী...